[১]
আনুমানিক ২০০৮ অথবা ৯ সাল। সকাল বেলা।

সামনের ঘরে বসেছিলাম, জানালা বরারব। হালকা রোদ আসছে। আমার ছোট বোন চা’য়ের কাপ নিয়ে হাজির। বললাম – আমি তো চা খাই না।

সে জোর করে আমার হাতে কাপ ধরিয়ে দিয়ে বললো – আমি বানিয়েছি।

নিলাম। এক চুমুক দিয়ে বললাম – চিনি কম ।

ও আবার উঠে, চিনি মিশিয়ে, আবার আমার পাশে বসল। আবার দুই চুমুক দিয়ে বললাম – ধুর, রঙ চা কেউ খায়?

ও কিছু বললো না। শুধু চুপ-চাপ বসে চা খাচ্ছিল, আর আমার অভিযোগ শুনছিল।

[২]
২০১৭ সাল
ফেসবুকের হোম ফিড স্ক্রল করছিলাম। দুম করে চোখ আটকে গেল এক গুচ্ছ ফুলের ছবির দিকে। সবুজ পাতার মধ্যে এমেথিষ্ট রত্নের রঙের কিছু ফুল ফুটে আছে।

বলা হয়ে থাকে এমেথিষ্ট না-কি আভিজাত্য, মায়ার প্রতীক। আমার বন্ধুও বোধ হয় মায়ায় জড়িয়ে গিয়েছিল ফুল গুলো দেখে।

লাইক রিএকশন দিয়ে অন্য ফিড দেখতে শুরু করলাম। দুই দিন বাদে আবার যখন নোটিফিকেশন দেখাচ্ছিল তখন খেয়াল করলাম – ফুলগুলো কোন সাজানো বাগানের নয়, নয় কোন টবের। বাড়ীর দেয়ালে নিতান্তই অযত্নে বেড়ে উঠেছে তারা।

[৩]

ওয়াশিংটন ডিসি’র মেট্রো রেলওয়ে ষ্টেশন। একজন বেহালাবাদক বসেছিলেন সাধারণ কাপড় আর সস্তা একটা ক্যাপ মাথায় দিয়ে।

কিন্তু তার হাতে ছিল পৃথিবীর সবচাইতে দামী বেহালা গুলোর একটা। বাজাচ্ছিলেন জগদ্বিখ্যাত শিল্পীদের সর্বাপেক্ষা জনপ্রিয় সুর।

অথচ মজার বিষয় হচ্ছে – সেদিন এক হাজার ৯৭ জন লোক তার সামনে দিয়ে যাতায়াত করলেও অল্প লোকই সেটা খেয়াল করেছিল, খুব কম লোক সুরের সৌন্দর্য কে ধরতে পেরেছিল, তার চাইতেও কম লোক দাঁড়িয়ে থেকে আরেকটু বেশী শুনেছিল।

১০৯৭ জন মানুষ সামনে দিয়ে হেঁটে গেলেও মাত্র ৭ জন মানুষ এই সৌন্দর্য কে ধরতে পেরেছিল। তারা দাঁড়িয়ে থেকে আরো কিছুক্ষণ শুনেছে। সর্ব সাকুল্যে ঐ বেহালাবাদক সেদিন মাত্র $52.17 পেয়েছিলেন।

অথচ ঠিক আগের সপ্তাহেই, ঠিক একই বেহালা বাদক, খ্যাতনামা এক কনসার্টে, সেই একই সুর বাজিয়ে ছিলেন এবং ঐ কনসার্টের প্রতিটি টিকেট বিক্রি হয়েছিল ৳১০০ ডলারে।

হ্যাঁ, এই পরীক্ষা টি করেছিল ওয়াশিংটন পোষ্ট। তারা জানতে চেয়েছিল – আমরা কি সৌন্দর্যকে ধরতে পারি, যদি সেটা অপ্রত্যাশিত ভাবে আমাদের কাছে ধরা দেয়?

[৪]
২০০৭ সাল।

সঞ্চিতি কাপুর এর বিজনেস ম্যাথ বই কিনে এনেছিলাম নীলক্ষেত থেকে।

অঙ্ক জিনিসটা দেখলে এমনিতেই আমার গা গুলিয়ে আসে। ক্লাস ফাইভে একবার অঙ্কে একশোতে মাত্র ৮ পেয়েছিলাম। সেই অঙ্ক এখনো পিছু ছাড়েনি। তাই নীরস বদনে বইটার পৃষ্ঠা উল্টাচ্ছিলাম। বইয়ের প্রথম দিকে একটা কবিতা চোখে পড়ল। অঙ্ক বইয়ে কবিতা – হা হা হা ।

যাই হোক , পড়া শুরু করলাম –

‘ …
If you have some kind word to say
Say them now.
Tomorrow may not come to your way;
Do a kindness while you may;
Loved one will not always stay;
Say them now.’

[৫]
মার্কিন লেখক জ্যাকসন ব্রাউন জুনিয়র তার পুত্রের জন্য কিছু নির্দেশনা রেখে গিয়েছিলেন। তাতে লেখা ছিল – ‘ভালো শ্রোতা হও । কারন, গুরুত্বপূর্ণ বস্তুগুলো অনেক সময় অপ্রত্যাশিত ভাবেই আসে’।

[৬]
আবারো ২০১৭ তে এলাম।

ইউটিউবে একটা ভিডিও দেখছিলাম। জয় শেঠী’র । উনি বলছিলেন – ‘আমার বিশ্বাস আমাদের উচিত জীবনের ছোট-ছোট জিনিস গুলোর উপর মাঝে-মাঝে গুরুত্ব দেয়া। কারন এক সময় যখন তুমি পেছন ফিরে চাইবে তখন হয়ত মনে হবে – ঐ ছোট জিনিসগুলোই ছিল জীবনের সর্বোত্তম কিছু।

আজ এত বছর পরে এসে আমার কাছে মনে হচ্ছে – সেদিন এক কাপ চা নিয়ে এত অভিযোগ আমি না করলেও পারতাম। জীবনের সবকিছুকে লজিক দিয়ে মাপতে হয় না।

আমি শুধু চা দেখেছি। চায়ের কাপে জড়িয়ে থাকা অনুভূতিকে দেখতে পাইনি।

_____________

[1] Image Credit: Ajanta Deb Roy