বিদায় | রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

কবিতাঃ বিদায়
কবিঃ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
আবৃত্তিঃ সজল কান্তি ঘোষ
সময়ঃ ৮ আগস্ট ২০১৯
স্থানঃ ব্রিজবেইন, অস্ট্রেলিয়া

[siteorigin_widget class=”WP_Widget_Media_Video”][/siteorigin_widget]

কালের যাত্রার ধ্বনি শুনিতে কি পাও।

তারি রথ নিত্যই উধাও

জাগাইছে অন্তরীক্ষে হৃদয়স্পন্দন,

চক্রে-পিষ্ট আঁধারের বক্ষ-ফাটা তারার ক্রন্দন।

ওগো বন্ধু, সেই ধাবমান কাল

জড়ায়ে ধরিল মোরে ফেলি তার জাল–

তুলে নিল দ্রুতরথে

দুঃসাহসী ভ্রমণের পথে

তোমা হতে বহুদূরে।

মনে হয় অজস্র মৃত্যুরে

পার হয়ে আসিলাম

আজি নবপ্রভাতের শিখরচূড়ায়,

রথের চঞ্চল বেগ হাওয়ায় উড়ায়

আমার পুরানো নাম।

ফিরিবার পথ নাহি;

দূর হতে যদি দেখ চাহি

পারিবে না চিনিতে আমায়।

হে বন্ধু, বিদায়।

কোনোদিন কর্মহীন পূর্ণ অবকাশে,

বসন্তবাতাসে

অতীতের তীর হতে যে রাত্রে বহিবে দীর্ঘশ্বাস,

ঝরা বকুলের কান্না ব্যথিবে আকাশ,

সেইক্ষণে খুঁজে দেখো, কিছু মোর পিছে রহিল সে

তোমার প্রাণের প্রান্তে; বিস্মৃতপ্রদোষে

হয়তো দিবে সে জ্যোতি,

হয়তো ধরিবে কভু নামহারা-স্বপ্নের মুরতি।

তবু সে তো স্বপ্ন নয়,

সব চেয়ে সত্য মোর, সেই মৃত্যুঞ্জয়,

সে আমার প্রেম।

তারে আমি রাখিয়া এলেম

অপরিবর্তন অর্ঘ্য তোমার উদ্দেশে।

পরিবর্তনের স্রোতে আমি যাই ভেসে

কালের যাত্রায়।

হে বন্ধু, বিদায়।

তোমার হয় নি কোনো ক্ষতি

মর্তের মৃত্তিকা মোর, তাই দিয়ে অমৃত-মুরতি

যদি সৃষ্টি করে থাক, তাহারি আরতি

হোক তব সন্ধ্যাবেলা।

পূজার সে খেলা

ব্যাঘাত পাবে না মোর প্রত্যহের ম্লানস্পর্শ লেগে;

তৃষার্ত আবেগবেগে

ভ্রষ্ট নাহি হবে তার কোনো ফুল নৈবেদ্যের থালে।

তোমার মানসভোজে সযত্নে সাজালে

যে ভাবরসের পাত্র বাণীর তৃষায়,

তার সাথে দিব না মিশায়ে

যা মোর ধূলির ধন, যা মোর চক্ষের জলে ভিজে।

আজও তুমি নিজে

হয়তো বা করিবে রচন

মোর স্মৃতিটুকু দিয়ে স্বপ্নাবিষ্ট তোমার বচন।

ভার তার না রহিবে, না রহিবে দায়।

হে বন্ধু, বিদায়।

মোর লাগি করিয়ো না শোক,

আমার রয়েছে কর্ম, আমার রয়েছে বিশ্বলোক।

মোর পাত্র রিক্ত হয় নাই,

শূন্যেরে করিব পূর্ণ, এই ব্রত বহিব সদাই।

উৎকণ্ঠ আমার লাগি কেহ যদি প্রতীক্ষিয়া থাকে

সেই ধন্য করিবে আমাকে।

শুক্লপক্ষ হতে আনি

রজনীগন্ধার বৃন্তখানি

যে পারে সাজাতে

অর্ঘ্যথালা কৃষ্ণপক্ষ-রাতে,

যে আমারে দেখিবারে পায়

অসীম ক্ষমায়

ভালোমন্দ মিলায়ে সকলি,

এবার পূজায় তারি আপনারে দিতে চাই বলি।

তোমারে যা দিয়েছিনু, তার

পেয়েছ নিঃশেষ অধিকার।

হেথা মোর তিলে তিলে দান,

করুণ মুহূর্তগুলি গণ্ডূষ ভরিয়া করে পান

হৃদয়-অঞ্জলি হতে মম।

ওগো তুমি নিরুপম,

হে ঐশ্বর্যবান,

তোমারে যা দিয়েছিনু সে তোমারি দান;

গ্রহণ করেছ যত ঋণী তত করেছ আমায়।

হে বন্ধু, বিদায়।

এই বর্ষায়

এই বর্ষায়

কবিঃ মেঘদূত

জানালায় বৃষ্টির ছটা
হৃদয়ের কপাট খোলা,
তুমি আমি বসি মখোমুখি
কিছু কথা যায়না বলা।

 

পাশে এসে হাত খানি ধরো
এই বর্ষার ঋতু আগমনে,
নি:সঙ্গতার রিম ঝিম ভেঙ্গে দাও
চোখে চোখ প্রেম নিবেদনে।

এভাবেই বসি কিছু কাল
যতো দিন বৃষ্টি না ফুরায়,
ততো দিন নেশা লেগে থাক
যতো দিন চোখ না জুড়ায়।

এমন দিনে তারে বলা যায়

শিরোনামঃ এমন দিনে তারে বলা যায় ,  কবিঃ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ,  আবৃত্তিঃ সজল কান্তি ঘোষ, এলবামঃ কবিতা পড়ার প্রহর,  রচনাকাল (বঙ্গাব্দ): ৩ জ্যৈষ্ঠ, ১২৯৬, রচনাকাল (খৃষ্টাব্দ): ১৭ মে, ১৮৮৯,  রচনাস্থান: খিরকী, পুনে, রেকর্ডিং তারিখঃ ০২ জুন ২০১৭

এমন দিনে তারে বলা যায়, এমন ঘনঘোর বরিষায়।এমন দিনে মন খোলা যায়–এমন মেঘস্বরে, বাদল-ঝরোঝরে, তপনহীন ঘন তমসায়॥ সে কথা শুনিবে না কেহ আর, নিভৃত নির্জন চারি ধার। জনে মুখোমুখি, গভীর দুখে দুখি, আকাশে জল ঝরে অনিবার–জগতে কেহ যেন নাহি আর॥

সমাজ সংসার মিছে সব, মিছে এ জীবনের কলরব। কেবল আঁখি দিয়ে   আঁখির সুধা পিয়ে, হৃদয় দিয়ে হৃদি অনুভব–আঁধারে মিশে গেছে আর সব॥ তাহাতে এ জগতে ক্ষতি কার, নামাতে পারি যদি মনোভার।শ্রাবণবরিষনে, একদা গৃহকোণে, দু’কথা বলি যদি কাছে তার, তাহাতে আসে যাবে কিবা কার॥

ব্যাকুল বেগে আজি বহে যায়, বিজুলি থেকে থেকে চমকায়। যে কথা এ জীবনে, রহিয়া গেল মনে, সে কথা আজি যেন বলা যায়–এমন ঘনঘোর বরিষায়॥

মেঘদূত

মেঘদূত

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

বহু দূরের অসীম আকাশ আজ বনরাজিনীলা পৃথিবীর শিয়রের কাছে নত হয়ে পড়ল। বললে, ‘আজ আমি আমার চন্দ্র সূর্য তারা সব হারিয়ে ফেলে এসেছি, আজ আমার একমাত্র তুমি আছ।’

পৃথিবী বললে, ‘আমার অশ্রুভরা হৃদয় হাওয়ায় হাওয়ায় চঞ্চল হয়ে কাঁপে, তুমি যে অবিচলিত।’

 

আকাশ বললে, ‘আমার অশ্রুও আজ চঞ্চল হয়েছে, দেখতে কি পাও নি? আমার বক্ষ আজ শ্যামল হল তোমার ঐ শ্যামল হৃদয়টির মতো।’

সে এই ব’লে আকাশ-পৃথিবীর মাঝখানকার চিরবিরহটাকে চোখের জলের গান দিয়ে ভরিয়ে দিলে।

যখন ঝিল্লীর ঝংকারে বেণুবনের অন্ধকার থর্‌থর্‌ করছে, যখন বাদল-হাওয়ায় দীপশিখা কেঁপে কেঁপে নিবে গেল, তখন সে তার অতি কাছের ঐ সংসারটাকে ছেড়ে দিয়ে আসুক, ভিজে ঘাসের গন্ধে ভরা বনপথ দিয়ে, আমার নিভৃত হৃদয়ের নিশীথরাত্রে।

মেঘ বলতে আপত্তি কি?

মেঘ বলতে আপত্তি কি ?

কবিঃ জয় গোস্বামী

আবৃত্তিঃ সজল কান্তি ঘোষ

মেঘ বলতে আপত্তি কি ?
বেশ, বলতে পরি
ছাদের ওপোর মেঘ দাঁড়াতো
ফুলপিসিমার বাড়ি
গ্রীষ্ম ছুটি চলছে তখন
তখন মানে ? কবে ?

আমার যদি চোদ্দো, মেঘের ষোলো-সতেরো হবে
ছাদের থেকে হাতছানি দিতো
ক্যারাম খেলবি ? … আয় …
সারা দুপুর কাহাঁতক আর ক্যারম খেলা যায়
সেই জন্যেই জোচ্চুরি হয়
হ্যাঁ, জোচ্চুরি হতো
আমার যদি চোদ্দো, মেঘের পনেরো-ষোলো মত।

ঘুরিয়ে দিতে জানতো খেলা শক্ত ঘুঁটি পেলে
জায়গা মত সরিয়ে নিতো আঙ্গুল দিয়ে ঠেলে
শুধু আঙ্গুল ? … বোর্ডের উপর লম্বা ফ্রকের ঝুল
ঝপাং ফেলে ঘটিয়ে দিতো ঘুঁটির দিক ভুল
এই এখানে … না ওখানে ..
এই এইটা না ঐটা
ঝাঁপিয়ে পরে ছিনিয়ে নিলো ঘুঁটির বাক্সটা
ঘুঁটির ও সেই প্রথম মরন
প্রথম মরা মানে ?
বুঝবে শুধু তারাই … যারা ক্যারাম খেলা জানে।
চলেও গেলো কদিন পরে .. মেঘ যেমন যায়
কাঠফাটা রোদ দাঁড়িয়ে পড়ল মেঘের জায়গায়
খেলা শেখাও, খেলা শেখাও, হাপিত্যেস কাক
কলসিতে ঠোঁট ডুবিয়ে ছিলো, জল তো পুরে খাক
খাক হোয়া সেই কলশি আবার পরের বছর জলে …
ভরল কেমন তোমায় ? …
ধ্যাত্, সেসব কি কেউ বলে ? …
আত্মীয় হয় .. আত্মীয় হয় ? আত্মীয় না ছাই
সত্যি করে বল এবার, সব জানতে চাই
দু এক ক্লাস এর বয়স বেশি, গ্রীষ্ম ছুটি হলে
ঘুরেও গেছে কয়েক বছর, এই জানে সক্কলে
আজকে দগ্ধ গ্রীষ্ম আমার তোমায় বলতে পারি
মেঘ দেখতাম, ছাদের ঘরে, ফুলপিসিমার বাড়ি।

Archives