আমার বারান্দার ছোট পরিসরে আছে সে। লতানো গাছ, ছোট-ছোট সবুজ পাতা। আর ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা নীল রঙের ফুল। কোন ঘ্রাণ নেই, কিন্তু অদ্ভুত সৌন্দর্য আছে তার। সকালের রোদে গাছে জল দেয়ার সময় মাঝে-মাঝে কিছুটা জল ফুটে থাকা ফুলের গায়েও ছিটিয়ে দেই। আর তখন দেখা যায় অপরুপ সৌন্দর্য।

ফোঁটায়-ফোঁটায় ছড়িয়ে পড়া জলের কনা, প্রভাতের সূর্যের আলোতে ঝিকি-মিকি করে জ্বলতে থাকে। আরো কাছে গেলে দেখা যায়, ঐ ছোট্ট ফোঁটা তার চারপাশের জগৎটাকে কেমন করে যেন ধারণ করে আছে।

 

 

গণিতের ভাষায় একে বলি আমরা সাবসেট। কিন্তু মজার বিষয় হচ্ছে – সাবসেট তার ইউনিভার্সেল সেটকে ধারণ করে আছে। অর্থাৎ বৈষ্ণবীয় তত্ব অনুযায়ী – অংশের মাঝে সমগ্র বিরাজমান।

এই ধারণা, এই অনুভুতি আমাদেরকে ভিন্ন কিছু শেখায়। সনাতন ধর্ম অনুযায়ী, দশবিধ সংস্কারের একটা পর্ব হচ্ছে – জাতকর্ম। এই পর্বে জন্মের পর পিতা জব , যষ্টিমধু ও ঘৃত দ্বারা সন্তানের জিহ্বা স্পর্শ করে একটি মন্ত্রোচ্চারণ করেন –

অঙ্গাদ অঙ্গাত সম্ভাভসী
হৃদয়াদ আভিযায়সে
আত্মা ভি পুত্র-নামাসি
সজীব শরদঃ শতং

অর্থাৎতুমি আমার হৃদয় হতে আমার অংশ হয়ে জন্মেছ। সন্তানরুপে তুমি মূলত আমারই আরেক সত্বা। আশীর্বাদ রইলো – শত শরৎ বেঁচে থাকো।

মন্ত্রটি মূলত বেদ এবং বৃহদারন্যক উপনিষদ থেকে নেয়া। অপূর্ব সুন্দর ভাবে ফুটে এসেছে – পিতা এবং সন্তানের সম্পর্কের বন্ধন। হে পুত্র – তোমার মাঝে আমি বিরাজমান, আমার মাঝে তুমি। ঠিক যেমনটি রবীঠাকুর লিখেছিলেন – ‘আমার মাঝে তোমার প্রকাশ।, তাই এত মধুর’।

শুধু পিতা এবং সন্তানের সম্পর্কেই নয়, স্বামী এবং স্ত্রীর সম্পর্কেও এই অনুভূতিকে প্রাধান্য দেয়া হয়েছে। হিন্দু বিয়েতে বর যখন স্ত্রীকে গ্রহণ করে তখন সে বলে – আমি শ্রী হীন, লক্ষী হীন। তুমিই আমার লক্ষী। সৌভাগ্য লাভের অভিপ্রায়ে আজ আমি তোমায় গ্রহণ করছি। তখন মন্ত্রোচ্চারণ করতে হয় –

ঔঁ অন্নপাশেন মণিনা, প্রাণসুত্রেণ গ্রন্থিনা ।
বধ্মামি সত্যগ্রন্থিনা মনশ্চ হৃদয়ং চ তে ।।
যদেতৎ হৃদয়ং তব, তদস্তু হৃদয়ং মম।
যদিদং হৃদয়ং মম, তদস্তু হৃধয়ং তব।।

অর্থাৎঃ অন্ন, প্রাণ, মন এবং সত্যের গ্রন্থিতে তোমায় আজ আমার সঙ্গে যুক্ত করে নিলাম। তোমার হৃদয় আমার হোক, আমার হৃদয় হোক তোমারি।

হৃদয় এবং অনুভূতি হিন্দু ধর্মে অনেক বড় একটা স্থান দখল করে আছে। মৃন্ময়ী প্রতিমাতে যখন আরাধনা করা হয় তখন সর্বাগ্রে সেই প্রতিমাতে চক্ষু এবং হৃদয় দান করতে হয়। নিষ্প্রাণ প্রতিমা তখন প্রাণোচ্ছল হয়ে উঠে। এটা একটা অনুভূতি, যেই অনুভূতি শুধু অনুভব করা যায়। কালির অক্ষরের নির্দিষ্ট কিছু বর্ণ সেই অনুভূতিকে প্রকাশের জন্য পর্যাপ্ত নয়।

আমার মা প্রতিদিন অপরাজিতা ফুল তুলে শ্রী কৃষ্ণকে অর্পন করেন। অপরাজিতা কৃষ্ণের প্রিয় ফুল। আরাধ্যকে তার প্রিয় বস্তু দিয়ে অর্চনার মাঝে যে কি অনুভূতি জড়িয়ে থাকে তা আমার মা আর বাসুদেব শ্রী কৃষ্ণই ভাল জানেন। আমি শুধু দূর থেকে দেখি তাদেরকে।