বই পড়তে ভাল লাগে কিনা?

ক্লাস ফোরে কম্পুটারের চাইতে প্রখর মগজধারী চাচা চৌধুরী থেকে শুরু। চৌধুরী থেকে মন্দোদরী, বিল্লু থেকে ব্যাটম্যান, রমণ থেকে ফ্যান্টম সবই পড়তাম। পিংকির নাম শুনে পিংক পিংক একটা ভাব এলেও, পিংকিকে কোনদিন পিংক কালারের জামা পড়তে দেখিনি। চৌধুরীর বাড়ীতে মুরগী চুরি, ভেনাস গ্রহের হোঁদল কুতকুত কন্যার সাথে সাবুর প্রেম, চাচীর রান্নার কেচ্ছা পড়ে হাসতে হাসতে পেটে খিল ধরে যেত।

 

ক্লাস সিক্স কিংবা সেভেন থেকে পাশা স্যালভিজ ইয়ার্ডে ঘুরাঘুরি করতে শিখে গেলাম। শান্তা দিদির কাছ থেকে প্রথম হাতে খড়ি হয় – ‘সৌকতে সাবধানহয়ে। কিংবদন্তী ভ্যাম্পায়ারদের সাথে তখনই বাতচিত হয় প্রথম বারের মত। তার পর সৈকত থেকে কিশোর পাশার সাথে প্রশান্ত মহাসাগরেও গিয়েছি। আফ্রিকাতেও ছিলাম। শুটকি টেরির সাথে মারপ্যাঁচ খেলতে গিয়ে ভুত থেকে ভুতেটেকনিক টা শিখে নিলাম। যৌবনে এসে জানতে পারি পরিসংখ্যানবিদরা এই ভুত থেকে ভুতেটেকনিক টাকে হুবহু মেরে দিয়েছে Snow Bowling Technique নামে. কী সাংঘাতিক চুরি রে বাবা ! স্বয়ং গোয়েন্দাদের টেকনিক মেরে দিল ঐ পরিসংখ্যানবিদরা?

হলিউড ছেড়ে না বলেকয়ে যখন সাইকেল নিয়ে নিকটবর্তী একটা দ্বীপে চলে যেত তিন বন্ধু তখন ভাবতাম ধুর শা***, আমাদের এলাকায় অমন দ্বীপ নাই কেন? তাহলে সাইকেল চেপে এসে, তাঁবু খাটিয়ে রাত কাটানো যেত। ছিপ দিয়ে মাছ ধরে ক্যাম্প ফায়ার করা যেত। রাতের বেলা ঝিঁঝিঁ পোকার শব্দ, সমুদ্রের গর্জন, ঠাণ্ডা বাতাস, দূর থেকে ভেসে আসা শেয়ালের ডাক, আর এক ফালি চাঁদ উফ কী মজাটাই না হতো।

কিশোর, মুসা, রবিনের সাথে মাঝেমাঝে জিনাও থাকত। তখন কল্পনার ডালপালা আরো বেড়ে যেত। মনে মনে ভাবতাম – ইসসসস … জিনার মত যদি আমারও একটা বান্ধবী থাকত?

কার্পেথিয়ান ক্যাসলে আইনজীবী জোনাথন হারকারের ডায়েরী থেকে ২২১ নং বি বেকার স্ট্রীটের ডাক্তার ওয়াটসনের ডায়েরী পর্যন্ত চলে এলো আমার কল্পনারা। বাস্কারভিলের জলাভূমিতে রাতের বেলা হোমসকে বিচরণ করতে দেখে যেমন ভয় পেয়েছিলাম, ঠিক তেমনই পুলকিতও হয়েছিলাম। তাল গাছের মত ঢ্যাঙ্গা লোকটা, সাড়াশির মত বাঁকা নাকে যখন পাইপের ধোঁয়া উড়াতো তখন আমার কল্পনা মাথা চাড়া দিয়ে উঠত।

ছোট বেলায় দাদুর হুঁক্কায় মিছেমিছি টান, পঞ্চম শ্রেণীতে বাড়ীর পেছনে Mr. Navy র পাছায় দুই টান, আর সব শেষে নবম শ্রেণীতে বন্ধুদের সাথে গুল্লীফে কিছু সুখ টান দেয়ার মধ্যেই হোমসের মত করে আমার ধোঁয়া ওড়ানোর অভিজ্ঞতা সীমাবদ্ধ। এই ২৮ বছরে এসে আমার কাছে এখনো মনে হয় এই আবর্জনা মানুষ কিভাবে খায়! টানা ২/৩ দিনেও নিঃশাস থেকে গন্ধ যায় না। আর কী যে বিশ্রী গন্ধ ওয়াক থু ! 

যদিও তামাক সেবন আমার অপছন্দের তবুও হোমসের ঠোঁটের ফাঁকে রাজকীয় ভঙ্গীতে পাইপের দৃশ্যটা আমার কাছে অসাধারণ লাগতো। মাথায় হ্যাট, ঠোটে পাইপ, আর গায়ে লম্বা কোট চাপিয়ে সারা ঘরময় পায়চারী করা হোমসকে কল্পনায় দেখে কত যে শিহরিত হয়েছি, বলার অতীত। মনেমনে ভাবতাম আমিও একদিন অমন হ্যাট চাপিয়ে, গায়ে লম্বা কোট ঝুলিয়ে, পাইপ ঠোঁটে ব্যাপক পোজ দিয়ে একটা ছবি তুলব।

কিন্তু সমস্যা হচ্ছে গায়েগতরে আমি হোমসের হাঁটুর সমান। অত ছোট কোট জীবনেও লন্ডনবাসী বানায় না। আর অর্ডার দিয়ে বানালেও শেষ পর্যন্ত, হোমস নয়, হাস্যকর দেখাবে।

হায় রে কল্পনা !

বামুন হয়ে চাঁদ ছুঁতে চাওয়া আর কি !

ঠিক এই একটা কারণে কোন এক চাঁদনী, আজ হতে অনেক বছর পূর্বে আমাকে অত্যন্ত রূঢ় ভাবে প্রত্যাখ্যান করেছিলো। চাঁদনী বুঝিয়েছিলো বামুন হয়ে চাঁদ ধরতে নাই।

যাক সে কথা।

কিশোর পাশা আর তার বন্ধুরা আমাকে এতটাই মুগ্ধ করেছিলো যে আমি রীতিমত লেখক বনে গেলাম। টানা ছয় মাস, স্কুলের লেইজার পিরিয়ডের সময় ক্লাসে বসে লিখেফেললাম আমার প্রথম উপন্যাস – The Conspiracy of Angela’s Death . অবশ্যই বিদেশী কাহিনীর ছারা অবলম্বনে 😉

ওহ হ্যাঁ, এর মধ্যে আবার রহস্য পত্রিকায় দুই পাতার একটা লেখাও পাঠিয়েছিলাম। মাস কয়েক পরে আমার ঠিকানায় একটা পত্রও এলো। তাতে লেখা ছিল – ‘প্রিয় লেখক, আপনার লেখা রহস্য পত্রিকায় প্রকাশের জন্য মনোনীত হয়েছে। আপনার সন্মানী নির্ধারণ করা হয়েছে ৭৫ টাকা … ‘

সেটাই ছিলো আমার লেখার প্রথম স্বীকৃতি , প্রথম উপার্জন। কিন্তু দুঃখের বিষয় হলো তখন আমি চাঁদপুর থাকি। ৭৫ টাকা সংগ্রহের জন্য আমাকে ঢাকা সেগুনবাগিচা অফিসে যেতে হবে। তাই, সত্যিমিথ্যা যাচাই করার আগেই জনম বাকীর খাতায় ৭৫ টাকা লিখে দিলাম।

তিন গোয়েন্দার পড় জুলভার্ণ পড়তে শুরু করলাম । স্কুল ফর রবিনসন্সআমার পড়া জুলভার্ণের শ্রেষ্ঠ বই। নাচের শিক্ষক প্রফেসর টার্টলেট কে নিয়ে অজানা দ্বীপে হারিয়ে যাওয়া, তার পড় প্রাকান্ড দেবদারু গাছের কোটরে রীতিমত ঘরকন্যা সাজিয়ে বই পড়া, মাছ ধরতে সাগরে যাওয়া, কফির কাপে চুমুক দেয়া আহা, চমৎকার একটা এডভেঞ্চারাস জীবন।

কফি আমার খুব প্রিয় একটা জিনিস। সারাদিনে আমি এক কাপ কফি খাই। কানে হেডফোন দিয়ে, চোখ বুজে গান শুনতেশুনতে,  কফির উষ্ণতা অনুভব করি। ওর ঘ্রাণ, একটু একটু করে ঠোঁটে নেয়া স্বাদ – একটা অদ্ভুত অনুভুতি দেয়। আমি বেশ ভাল কফি বানাতে পারি। প্রিয় মানুষকে নিয়ে কফি খেতে আমার বেশ ভাল লাগে।  গল্প করতে-করতে চমৎকার একটা সময় কেটে যায়। আর আমি ফিরে পাই প্রাণ চাঞ্চল্য।

কিছুদিন আগে,এমনই প্রিয় একজনের জন্য কফি নিয়েছিলাম। কিন্তু সে এমন ভাবে প্রত্যাখ্যান করেছে যে নিজের মধ্যে লালন করা সুন্দর অনুভূতি, আবেগ গুলো মুহুর্তেই শ্বাসরুদ্ধ হয়ে মারা যায়। পুরো দুই সেকেন্ড আমি তার চোখের দিকে তাকিয়ে ছিলাম।

হাসিমুখে বিদায় জানিয়ে আমি ঘরে ফিরতে শুরু করি। ফেরার পথে রাস্তা দিয়ে যখন হাঁটছিলাম তখন মনে হচ্ছিল পেছন থেকে এগিয়ে আসছে আমার অনুভূতির শবযাত্রা। শ্বাস রোধে ওদের শরীর নীল হয়ে গেছে, আর শ্মশান বন্ধুরা উড়াচ্ছে বিন্নি খৈ।